নদীর বাঁকে বাংলার শিকড় : পদ্মা থেকে বগুড়া হয়ে ব্রহ্মপুত্রে ঐতিহাসিক যাত্রা!
বাংলাদেশের নাম বিশ্বের দরবারে উচ্চারিত হলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে এক ঘনবসতিপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে লড়াকু একটি দেশের ছবি। কিন্তু যে প্রশ্নটি আমাদের ভাবায় না তা হলো, সীমিত সম্পদে ঘেরা এই জনপদ কীভাবে হাজার বছর ধরে সগৌরবে টিকে আছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের ধমনিতে বয়ে চলা অসংখ্য নদ-নদীর মাঝে। নদীই এদেশের টিকে থাকার প্রধান শক্তি, যা প্রাকৃতিক নিয়মেই তৈরি করে দিয়েছে এক টেকসই জীবন ব্যবস্থা। এই নদী কেবল প্রাণের সঞ্চার করে না, তৈরি করে দেয় সাংস্কৃতিক ভিন্নতাও।
ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার বিশাল অববাহিকা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, নদীর পূর্ব তীরের মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে পশ্চিম তীরের এক চমৎকার বৈচিত্র্য বিদ্যমান, যা আমাদের যাপিত জীবনের এক দারুণ বৈপরীত্য।
আমাদের এই ঐতিহাসিক যাত্রার শুরু হয় প্রাচীন বঙ্গে বাণিজ্যের সর্বপ্রথম এবং অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক রুট দিয়ে। নদী আমাদের শিকড় চিনিয়ে দেয় এবং আজ আমরা সেই পথেই ছুটে চলেছি যা এক সময় বঙ্গদেশকে যুক্ত করেছিল বিশ্বখ্যাত ‘সিল্ক রোড’-এর সাথে। এই বাণিজ্যের সূতিকাগার ছিল বগুড়ার মহাস্থানগড় বা পুণ্ড্রবর্ধন, যা খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকেরও আগে থেকে এক সমৃদ্ধ নগর সভ্যতা হিসেবে পরিচিত ছিল। এই অঞ্চলের উর্বর পলি মাটি আখ চাষের জন্য বিখ্যাত ছিল এবং এখান থেকেই উৎপাদিত উচ্চমানের তরল/ঝোলা গুড় উৎপাদিত হতো।
প্রাচীন বঙ্গে উৎপাদিত এই আখের রস থেকে তৈরি হওয়া ঝোলা গুড়কে ক্রিস্টাল করার বিশেষ প্রযুক্তি তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলে ছিলনা। চীন থেকে সেই প্রযুক্তি পূর্ণতা পেয়ে ফিরে আসার পর থেকেই আমরা একে 'চিনি' নামে ডাকি।
এই বাণিজ্যের জাল বিস্তৃত ছিল চট্টগ্রাম থেকে কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দর পর্যন্ত। চট্টগ্রাম উপকূল থেকে উৎপাদিত লবণ নৌপথে নিয়ে আসা হতো কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দরে। কুড়িগ্রাম জেলাটি ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারসহ অসংখ্য নদীর মিলনস্থল হওয়ায় এটি প্রাকৃতিকভাবেই একটি বিশাল নৌ-ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল।
চট্টগ্রাম থেকে আসা লবণ এবং মহাস্থানগড় থেকে আসা চিনি এই চিলমারী বন্দরে একত্রিত হয়ে পরবর্তী যাত্রার জন্য প্রস্তুত করা হতো। এখান থেকে পণ্যবাহী নৌকা ‘ডুয়ার্স’ অঞ্চল হয়ে তিব্বতে পৌঁছাত এবং সেখান থেকেই তা ছড়িয়ে পড়ত দূরপ্রাচ্য ও ইউরোপ পর্যন্ত, এই সিল্ক রোডের মাধ্যমে।
এমনকি রংপুরের বিখ্যাত ‘জাহাজ কোম্পানির মোড়’ আজও সাক্ষ্য দেয় যে চিলমারী বন্দরে আসা জাহাজের যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এই এলাকাটি।
যখন আমরা সিরাজগঞ্জ থেকে সারিয়াকান্দি হয়ে দেওয়ানগঞ্জের দিকে এগোচ্ছিলাম, তখন মনের পাতায় ভেসে ওঠে বাহাদুরাবাদ ঘাটের সোনালী দিনগুলোর কথা। আজকের এই প্রমত্তা যমুনা এক সময় ছিল অত্যন্ত সরু একটি নদী।
১৭৮৭ সালের এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের ফলে ব্রহ্মপুত্রের প্রধান ধারাটি ময়মনসিংহ থেকে সরে এসে বর্তমান যমুনার খাতে আছড়ে পড়ে, যা আজ যমুনার মূল পানির উৎস। ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশরা এখানে যে বিশাল রেলওয়ে ফেরি সার্ভিস চালু করেছিল, তা ছিল তৎকালীন বিশ্বের এক বিস্ময় এবং উত্তরবঙ্গের সাথে ঢাকার যোগাযোগের লাইফলাইন। তবে এই সমৃদ্ধির সমান্তরালে রয়েছে নীলকরদের অত্যাচারের কালো ইতিহাস, যার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেওয়ানগঞ্জের নীলকুঠিগুলো।
মহাস্থানগড়ের প্রত্নতত্ত্ব, বাহাদুরাবাদ ঘাটের ব্রিটিশ ঐতিহ্য এবং কুড়িগ্রামের ১৬টি নদীর বৈচিত্র্যময় মিলনস্থলকে এক সুতোয় গেঁথে পর্যটকদের সামনে উপস্থাপন করলে এটি কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই আনবে না, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের শিকড়ের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরবে।
কুড়িগ্রামের চিলমারী ও রৌমারী হয়ে ডুয়ার্সের পাহাড়ী হাতছানি পর্যন্ত বিস্তৃত এই জলপথ পর্যটনের এক অনন্য ক্ষেত্র হতে পারে, যা আমাদের হাজার বছরের বাণিজ্যের গৌরবগাথাকে আবারো বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করবে।
এই পুরো অববাহিকাকে কেন্দ্র করে ভুটান, ইন্ডিয়া, নেপাল এবং বাংলাদেশ (BBIN) মিলিয়ে একটি পরিকল্পিত রিভার ট্যুরিজম বা নদী-পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে আমাদের এই দীর্ঘ ইতিহাস ও সমৃদ্ধি পুনর্জীবিত হবেবলে আমাদের অভিযাত্রীদের বিশ্বাস।
রাহি রাফসান, সিইও
ট্যুর গ্রুপ বিডি
